সাহিত্যের সংকট আছে, তবে তা ফেসবুকের কারণে ঘটেনি : আলতাফ শাহনেওয়াজ

0
401

আলতাফ শাহনেওয়াজ :

বর্তমানে যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে ফেসবুক নিঃসন্দেহে এগিয়ে। তবে ফেসবুকের কারণে দৈনিক বা অনলাইনের সাহিত্য কোনো সংকটে পড়েছে কি না—এ প্রশ্নে আমার সহজ উত্তর হলো, না। আমার বিবেচনায়, ফেসবুক এখন আমাদের দিনপঞ্জির স্থান দখল করেছে। আগে আমরা মনের ভাবগুলো দিনপঞ্জিতে টুকে রাখতাম, এখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ব্যক্ত করি মনের ভাব—পার্থক্য এটুকুই। সেদিক থেকে দেখলে আমাদের দেশে ফেসবুক এখন অনেকটা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো হয়ে উঠেছে। স্বীকার করি, যোগাযোগের জন্য এটি ভালো মাধ্যম। তবে ফেসবুকের কারণে দৈনিক বা অনলাইনের সাহিত্য কোনো সংকটে পড়েছে—এমনটি আমি আমি মনে করি না। এখানে যদি সংকট নিয়ে কথা ওঠে, তো বলা যেতে পারে যে, হ্যাঁ, সাহিত্যের সংকট আছে, তবে তা ফেসবুকের কারণে ঘটেনি। এর পেছনে যে বাস্তবতা ক্রিয়াশীল তা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈকিত বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত।
বাংলা ট্রিবিউন : ‘দেশ’-এ কবিতা ছাপা হলেও ছবি তুলে স্ট্যাটাস দিতে হয়। ফেসবুকের সঙ্গে কি প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য দৌড়ে পারছে না?
আলতাফ শাহনেওয়াজ : প্রশ্নের ধরন দেখে মনে হচ্ছে ‘দেশ’ একটি মানদণ্ড এবং ফেসবুক একটি মানদণ্ড। আমি কিন্তু বিষয়টিকে এভাবে দেখতে নারাজ। যাঁরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদের লেখাজোকা প্রচার করেন বা করছেন, সেটা সম্পূর্ণই তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার—ব্যক্তিগত অভিরুচি। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক—কোনো ধরনের সাহিত্যের সম্পর্ক নেই; সাহিত্যেরও সম্পর্ক নেই। আর সাহিত্য কোনো দৌড় বা রেসের বিষয় বলেও আমি মনে করি না।
বাংলা ট্রিবিউন : গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, অনুবাদ—এই তো আমাদের সাহিত্য সাময়কী, এবং লেখকরাও প্রায় ঘুরেফিরে নির্ধারিত। আপনি কি মনে করেন, দৈনিক/অনলাইনের সাহিত্য সমকালীনতা বুঝতে পারছে না, বা কেমন হওয়া উচিৎ তার সাহিত্য?
আলতাফ শাহনেওয়াজ : দেখুন, সাহিত্যের যে ‘জেনর’ বা শ্রেণিকরণ—মানে, এটা কবিতা, এটা গল্প, এটা প্রবন্ধ—এগুলো কিন্তু আমরা ঠিক করিনি। এগুলো এসেছে পাশ্চাত্য থেকে, পরে আমরা সেগুলো গ্রহণ করেছি। এখন আমাদের দেশের সাহিত্য সাময়িকীগুলোর চেহারা প্রসঙ্গে যে প্রশ্নটি করা হলো, এক অর্থে তা সত্যি বটে। তবে আমার বিবেচনায়, শেষঅব্দি বিষয়টি ঠেকে ভালো লেখা ও মন্দ লেখায় গিয়ে। ভালো লেখা যে সবসময় পাওয়া যাবে বা যায়, এমন তো নয়। এ বাস্তবতাটির প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। তবে কোনো সাহিত্য সম্পাদকই খারাপ লেখা ছাপেন বা ছাপতে চান বলে আমি মনে করি না। আর ‘নির্ধাারিত লেখক’ প্রসঙ্গে বলি : আমি কিন্তু ‘নির্ধারিত লেখক’-এর পক্ষপাতি। এই ‘নির্ধারিত লেখক’ ব্যাপারটি সব সময় ছিল—সেটি যেমন গত শতকের তিরিশের দশকে ছিল, পঞ্চাশের দশকে ছিল, তেমনি এখনো আছে—প্রতিষ্ঠান ও ছোটকাগজ—দুই স্তরেই আছে। সম্পাদক যে লেখকে আস্থা করবেন, তাঁকে দিয়েই তো লেখাবেন—এর মধ্যে খারাপ কিছু নেই। খারাপ হবে তখন, যখন ‘নির্ধারিত লেখকের’ বাইরে অন্য কারো প্রকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। কোনো সাহিত্য সম্পাদকই এমন করেন বলে আমি মনে করি না।
আমাদের পত্রিকায় অনেক নতুন লেখকের লেখা ছাপা হয়েছে, এখনো হয়। এই ধারাটি আমরা ধরে রাখতে চাই। কিন্তু যখনই একজন লেখকের লেখা দ্বিতীয়বার ছাপা হয়, তখনই কেউ কেউ তাঁর বুকে ‘নির্ধারিত লেখক’-এর তকমা সেঁটে দেন। এ প্রবণতাও যথেষ্ট ভয়ংকর। প্রথমে দেখা দরকার যে লেখাটি ছাপা হলো, সেটি ভালো কি মন্দ। তারপর তো নির্ধারিত-অনির্ধারিত—ইত্যকার বিচার।
বাংলা ট্রিবিউন : সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে আপনি কি প্রাতিষ্ঠানিক রুচি বা ইচ্ছা দ্বারা প্ররোচিত হন?
আলতাফ শাহনেওয়াজ : প্ররোচিত হই না, প্ররোচিত হওয়ার সুযোগ নিতেও চাই না; সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমি বরং প্রতিষ্ঠানের রুচির মধ্যে থাকতে পছন্দ করি। যেহেতু আমি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছি, প্রতিষ্ঠানকে ধারণ করছি, ফলে প্রতিষ্ঠানের রুচির ভেতরে থাকা স্বাস্থ্যকরও বটে।
বাংলা ট্রিবিউন : একদিকের বক্তব্য, ফেসবুকের সাহিত্য ‘অসম্পাদিত এবং অনির্বাচিত’—লেখক তার উৎকর্ষ কোথায় তা বুঝতে পারেন না। অপরদিকে, সাহিত্য সম্পাদকরা তাদের লেখক তালিকার মধ্যেই থাকতে বেশি পছন্দ করেন—এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
আলতাফ শাহনেওয়াজ : এ বিষয়ে আগের একটি প্রশ্নে উত্তর দিয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন : সংবাদমাধ্যমে কেমন সাহিত্য হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?
আলতাফ শাহনেওয়াজ : আসলে সংবাদমাধ্যমের নিজের সাহিত্য হওয়ার সুযোগ সম্ভবত নেই। কারণ তার কাজ সুসাংবাদিকতা করা। তবে যদি সংবাদপত্র বা অনলাইন পোর্টালের সাহিত্য সাময়িকীর কথা বলা হয়, তবে বলব, যুগের দাবি অনুযায়ী সাহিত্যভোক্তারা যে ধরণের লেখা পছন্দ করে থাকেন, তেমন লেখা বা সাহিত্যকর্ম ছাপা হওয়া উচিত।