বাংলাদেশে ভুমিষ্ট হলো রোহিঙ্গা শিশু

0
545

ইসমাইল সাজ্জাদ-

সোমবার সকাল ৯ ঘটিকা শাপলাপুরের আকাশে ঝকঝকে রোদ। খোলা আকাশের নিচে প্রসব যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন আলেয়া। আশপাশে বাড়িঘর নেই। অনুপায় হয়ে স্বজনরা এক টুকরো কাপড় টাঙিয়ে নিলেন। সেখানেই আলেয়ার কোল আলো করে জন্ম নিলো ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান। ছেলের মুখ দেখেই যন্ত্রণা ভুলে আলেয়ার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি আসলো। কিন্তু এই হাসি ক্ষণিকের। কেননা, সোনালী রোদে জন্ম নেয়া এই শিশুটি মিয়ানমার জান্তার অবিচারে জন্মক্ষণ থেকেই উদ্বাস্তু। এ যেনো মানবতার করুণ এক ট্রাজেডি।

আলেয়ার বাড়ি মংডুর ফকিরা বাজারে। স্বামী শাশুড়ি ও দুই সন্তান নিয়ে কাটছিলো তাদের সুখের সংসার। অনাগত সন্তানের আশায় দিনও গুনছিলেন। কিন্তু এর মাঝেই রাখাইনে নৃশংসতা শুরু হলো। ৩০ সেপ্টেম্বর বাড়িতে এলো মিয়ানমার সৈন্যরা। এসেই ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলো। স্বামী আবদুর করিম ঘর থেকে বেরিয়েই সেনা অফিসারের পায়ে পড়েন। ওই অবস্থাতেই তাকে গুলি করে আরেক সেনা।

শুরু হয় স্বামী হারা আলেয়ার উদ্বাস্তু জীবন। মা ও ভাইদের সাথে দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়ান। কোরবানির ঈদের দিনেই রওয়ানা হন বাংলাদেশের দিকে। পেটে সন্তান নিয়েই মাইলের পর মাইল হেঁটে এগুতে থাকেন টেকনাফের দিকে। দুর্গম এই পথ যেনো শেষই হচ্ছিলো না। তারপর আসেন নাফ নদীতের তীরে। উঠেন নৌকায়। কিছুদূর আসার পরই স্রোতের তোড়ে ছোট ছেলে শহিদুল পানিতে ভেসে যায়। সেই কষ্ট বুকে নিয়ে গত শনিবার এসে পৌঁছেন বাংলাদেশের টেকনাফে। সেখানে বাধা পেয়ে নৌকায় করে চলে আসেন কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের গ্রাম শাপলাপুরে। গত দুইদিন সেখানেই অবস্থান করছিলেন।

স্বামী ও সন্তান হারোনো উদ্বাস্তু আলেয়া বলছিলেন, শহিদুলের কথা তিনি ভুলতেই পারছেন না। এখন নতুন সন্তান এসেছে। বৃষ্টি হলে অন্যদের সাথে সেও ভিজবে। তার উপর পেটে খাবার নেই। বুকে দুধ নেই। তাকে কিভাবে বাঁচাবেন তা তিনি ভাবতেই পারছেন না।

অনুপ্রবেশকারী তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে টেকনাফ উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির, রাস্তার ধারে কিংবা ঝোপঝাড়ে এরকম অসংখ্য আলেয়ার দেখা মিলবে। যারা সবাই মিয়ানমার থেকে এসে বাংলাদেশে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। আর জন্ম নেয়া এসব নবজাতকদের ভাগ্যে জন্মক্ষণ থেকে উদ্বাস্তু জীবন ঝুটেছে। কে জানে, জন্মের পর নিজের কোনো দেশ থাকবেনা জানলে তারা জন্মাতো কিনা!

অনেকে মা আবার এক মাস, এক সপ্তাহ বয়সী সন্তান নিয়েও মাইলের পর মাইল পাহাড়, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন। তাদের এমন অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্পগুলো তাদের নিজেদেরও বিশ্বাস হচ্ছেনা ! আবার আগে থেকে টেকনাফ উখিয়ায় অবস্থান করা রোহিঙ্গা নারীরা যেসব সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন তাদের ভাগ্যেও ঝুটছে শরনার্থী জীবন